ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সম্ভাবনা

একটি বর্ণাঢ্য যাত্রা: হাসানপুর শহীদ নজরুল সরকারি কলেজ

একটি বর্ণাঢ্য যাত্রা: হাসানপুর শহীদ নজরুল সরকারি কলেজ

“একটি জ্ঞানের আলোকবর্তিকা—যেখানে জীবন প্রস্ফুটিত হয়, স্বপ্ন হাতছানি দেয়। যেখানে ঝরে পড়া ফুল আবার নতুন জীবন খুঁজে পায়। যেখানে মায়াবি সবুজ ক্যাম্পাসের প্রতিটি বৃক্ষ যেন রূপকথার গল্প শোনায়।”

একটি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল চারদেয়ালের ইট-পাথরের বিন্যাস কিংবা সুরম্য স্থাপত্যের আড়ম্বর নয়, নয় কোনো শুষ্ক ফলাফলের খতিয়ান মাত্র। প্রতিষ্ঠান হলো ভাবনার এক উর্বর ভূমি, যা এক ঝাঁক তরুণ প্রাণকে মহৎ স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ করে, তাদের সুপ্ত প্রতিভার উন্মেেষ ঘটায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের সুদক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তোলে। সেই কালজয়ী অঙ্গীকার ও আলোকদীপ্ত প্রত্যয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আজ সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাসানপুর শহীদ নজরুল সরকারি কলেজ।

সবুজের স্নিগ্ধ প্রলেপে ঢাকা এক শান্ত-সুনিবিড় প্রাঙ্গণ, গৌরবময় ঐতিহ্য, নিবেদিতপ্রাণ গুণী শিক্ষকদের অপরিসীম দিকনির্দেশনা এবং দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর চঞ্চল প্রাণের কলকাকলিতে প্রতিদিন স্পন্দিত হয় এই পুণ্য বিদ্যাপীঠ। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একেবারে পাশ ঘেঁষে অবস্থিত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকেও কলেজটি অত্যন্ত সুসংগম। কালের অমলিন পরিক্রমায় আধুনিক মনন ও প্রগতির অপূর্ব মেলবন্ধনে প্রতিষ্ঠানটি আজ নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় সমাসীন করেছে।

১৯৬৯ সালের ৩০ জুনের এক শুভলগ্নে সূচনা ঘটেছিল এই মহীয়সী আলোকযাত্রার। শিক্ষানুরাগী ও প্রাতঃস্মরণীয় দানবীর আবদুস সামাদ-এর সুদূরপ্রসারী ভাবনা ও মহতী পদক্ষেপে এই নিভৃত জনপদে আলো জ্বালানোর প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল, যার মূল দর্শন ছিল সর্বস্তরের মানুষের মাঝে উচ্চশিক্ষার অর্ঘ্য পৌঁছে দেওয়া এবং এক বিবেকবান প্রজন্ম গড়ে তোলা।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আঞ্চলিক শিক্ষার প্রসারে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের ৪ অক্টোবর কলেজটি জাতীয়করণের গৌরব অর্জন করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর সন্তান শহীদ নজরুল ইসলামের অমর স্মৃতি ও আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে পরবর্তীতে বিদ্যাপীঠটির নামকরণ করা হয়—হাসানপুর শহীদ নজরুল সরকারি কলেজ। প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ পথচলায় এই প্রাঙ্গণ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অজস্র কৃতী সন্তান আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিগন্তে নিজ নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।

প্রায় ৮.১ একরের সুবিশাল সবুজ নীড়জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস যেন প্রকৃতির এক রূপময় নিকেতন। সুপরিকল্পিত পাঠদানের উদ্দেশ্যে এখানে গড়ে উঠেছে নান্দনিক তিনতলা একাডেমিক ভবন, সুবিশাল ডিগ্রি ভবন এবং আধুনিক স্থাপত্যের সুরম্য ছয়তলা বিজ্ঞান ভবন।

তিনতলা একাডেমিক ভবন
তিনতলা ডিগ্রি ভবন
দৃষ্টিনন্দন ছয়তলা বিজ্ঞান ভবন

একাডেমিক ভবনের ঠিক পেছনেই প্রসারিত হয়ে আছে এক সুবিশাল ও নীলচে কাঁচের মতো দিঘি। যেখানে মৃদু হাওয়া লাগলেই ঢেউয়ের ভিড় জমে, আর জলে টুপ করে ডুব দিয়ে পানকৌড়িরা শিকারের আনন্দে মেতে ওঠে। দিঘির পাড়ঘেঁষা গাছে গাছে হরেক পাখির মিষ্টি গান আর স্নিগ্ধ বাতাস পুরো প্রাঙ্গণে এনে দেয় এক রূপকথাময় আবহ। শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাচ্ছন্দ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যকর ক্যাফেটেরিয়া, আত্মিক প্রশান্তির জন্য সুবিশাল প্রাঙ্গণের সম্মুখভাগে নির্মিত একটি সুন্দর মসজিদ এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে বিকশিত হওয়ার এক বিস্তীর্ণ ক্রীড়াঙ্গন। প্রায় দুই শতাধিক ছায়াবৃক্ষের নিবিড় উপস্থিতি পুরো ক্যাম্পাসকে সারাবছর সজীব রাখে, যা নিবিড় পাঠগ্রহণে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। তাছাড়া ডিগ্রি ভবনের ঠিক পেছনেই রয়েছে ছাত্রাবাস সহ সুদূরপ্রসারী ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলার উজ্জ্বল সম্ভাবনা।

একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত প্রাণশক্তি তার শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীদের সুনিবিড় মেলবন্ধন। বর্তমানে অনুমোদনপ্রাপ্ত ৩১টি পদের বিপরীতে ২৫ জন পরম শ্রদ্ধেয় ও মেধাবী শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মেধা ও মনন বিকাশে সততার সাথে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের সার্বিক পরিচর্যায় দুই সহস্রাধিক উদ্যমী তরুণের স্বপ্ন প্রতিদিন নতুন ডানা মেলে—কেউ চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার আশায়, কেউ বা গবেষক, শিক্ষক কিংবা দেশের প্রতিভাবান নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশের সংকল্পে উদ্বুদ্ধ হয়।

একবিংশ শতাব্দীর এই অদম্য গতিময়তার যুগে জ্ঞানের সাথে প্রযুক্তির সেতু বন্ধন আবশ্যিক। সেই তাগিদ থেকেই কলেজটিতে যুক্ত হয়েছে প্রগতিশীল নানা উদ্ভাবনী প্রযুক্তি—

মাল্টিমিডিয়া সম্বলিত আধুনিক শ্রেণিকক্ষ
ডিজিটাল তথ্য আদান-প্রদান ও মেসেজিং ব্যবস্থা
সহজবোধ্য ও গতিশীল প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট
স্বয়ংক্রিয় অনলাইন ফলাফল প্রকাশ ব্যবস্থা

ডিজিটাল সেবার এই আধুনিকীকরণে শিক্ষার্থীরা যেমন নিমিষে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ও ফলাফল পাচ্ছে, তেমনই অভিভাবকরাও ঘরে বসেই তাঁদের সন্তানের শিক্ষাজীবনের অগ্রগতির খোঁজ রাখতে পারছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সহশিক্ষা কার্যক্রম, সাহিত্য চর্চা ও ক্রীড়ার মেলবন্ধন। পাঠ্যসূচির গণ্ডি ছাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক মনন গড়ে তোলাই কলেজের প্রধান দর্শন। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় এখানকার শিক্ষার্থীদের দীপ্ত উপস্থিতি কলেজের গৌরবগাথাকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করছে।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—এই আত্মিক ত্রিভুজ বন্ধনই প্রতিষ্ঠানটির মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষকের স্নেহ ও সুপরামর্শ, শিক্ষার্থীর অদম্য নিষ্ঠা এবং অভিভাবকের অফুরন্ত আস্থার সমাহারে প্রতিমুহূর্তে রচিত হচ্ছে সাফল্যের নতুন কাব্য।

১৯৬৯ সালে রোপিত সেই ছোট্ট সম্ভাবনার বীজটি আজ হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নপূরণের এক বিশাল মহীরুহে রূপ নিয়েছে। হাসানপুর শহীদ নজরুল সরকারি কলেজ কেবল একটি প্রথাগত শিক্ষাঙ্গন নয়—এটি এই অঞ্চলের মানুষের আস্থা, ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার এক অবিনশ্বর আলোকস্তম্ভ। অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্যকে পাথেয় করে এবং নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাকে পালে তুলে এই বিদ্যাপীঠ নিরন্তর ধাবমান এক প্রগতিশীল, মানবিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে।